ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমস্যা পুরো জাতির সংকট – রানা দাশগুপ্ত


বাংলাদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমস্যা শুধু সংখ্যালঘুর নয় পুরো জাতির সংকট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, একাত্তরে পরাজিতরা নির্মূল হয়নি। আজও তারা সক্রিয়। নানা ছদ্মাবরণে সরকারি দলের ভিতরে-বাইরে অবস্থান করছে তারা। বাংলাদেশের ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুদের সমস্যা শুধু তাদের সমস্যা নয়। এটা জাতীয় সমস্যা। এটা জাতীয় সংকট। সেভাবেই বিবেচনা করেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ পুন:প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন রক্ষা করতে হবে। আমাদের স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থে। ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুরা এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সাথে কোনোদিন বেঈমানি করেনি।
গতকাল শুক্রবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের পুরাতন নগর ভবনের কে.বি আবদুচ সাত্তার মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। হিন্দু সমাজকল্যান পরিষদের উদ্যোগে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে অসহায় মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। রাজনীতিবিদদের প্রতি প্রশ্ন রেখে মানবাধিকার নেতা রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ১৯৪৭ সালের পূর্ব বাংলার ২৯ দশমিক ৭ ভাগ ছিল সংখ্যালঘু। ১৯৭০ এ তা নেমে আসলো ২০ শতাংশে। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ৭০’র ২০ শতাংশ ৫০ বছর পেরিয়ে ১০ শতাংশে নেমে এলো কেন? কী কারণে? তারা দেশত্যাগে বাধ্য হলো কেন? বাধ্য করছেন কারা? মুজিব কোর্ট গায়ে দিলেই সবাই আওয়ামী লীগ হয় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনেক ভালো কাজ আজ নষ্ট করে দিচ্ছে কারা? কেন দিচ্ছে? গায়ে তাদের কিসের পোশাক? অর্জনগুলো নষ্ট করে দিচ্ছে আর তারপর যদি বলেন কাউয়া ঢুকেছে, আর পাখি ঢুকেছে- হবে? এতে সুযোগ পাচ্ছে কারা? প্রতিক্রিয়াশীলরা। তিনি বলেন, ৭২’র সংবিধান রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু ৭৫’এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে পাকিস্তান বানানো অপচেষ্টা শুরু হয়। ৭৫’র হত্যাকান্ডে যারা জড়িত ছিল তারা চেয়েছিল পাকিস্তানের মত রাষ্ট্রীয় সংবিধানে সাম্প্রদায়িকীকরণ করতে। রাজনীতি যদি প্রকৃত অর্থে অসাম্প্রদায়িক না হয়, রাষ্ট্র যদি প্রকৃত অর্থে ৭২’র সংবিধানে ফিরে না আসে- তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়া, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সংবিধান এখনো জিয়া-এরশাদের প্রেতাত্মা থেকে মুক্ত হতে পারেনি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানি সংবিধানের আদলে সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে। একই ধারায় জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধানে সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে। এর লক্ষ্য একটাই, পাকিস্তানি আদলে বাংলাদেশেও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুকে রাষ্ট্রীয় সংখ্যালঘুতে পরিনত করা। আজকে ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার এসেছে কিন্তু জিয়াউর রহমান ও এরশাদের প্রেতাত্মা থেকে এখনো বাংলাদেশের সংবিধান মুক্ত হতে পারেনি। রানা দাশগুপ্ত বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও কেন পুলিশ প্রহরায় পূজা করতে হবে? আর পুলিশ পাহারায় পূজা করে আমাদেরকে বলতে হবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির। কেন বলতে হবে? এটা তো সত্য কথা না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যদি অনন্য নজির থাকতো তাহলে তো পুলিশ প্রত্যাহার করে স্বাধীনভাবে যদি পূজার ব্যবস্থা করা যেত তাহলেই বুঝা যেত সম্প্রীতির লেবেলটা কোন জায়গায়।
পরিষদের উপদেষ্ঠা সাংবাদিক প্রীতম দাশ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইউনুস গনি চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এখনো দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে। সমাজে দুষ্টু লোকের অভাব নেই। আওয়ামী লীগের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক মানুষ লুকিয়ে আছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু-মুসলমান সকলে যুদ্দে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য। এখন কেন প্রশ্ন আসে- কে সংখ্যালঘু, কে সংখ্যাগুরু। এ দেশের সংখ্যালঘুরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভূমিদস্যুতার শিকার হচ্ছেন। এসব ধর্ষন-নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীরা যদি সরকার দলীয় কোন নেতাকর্মীও হয়, তাদের যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা পুজা উদযাপন পরিসদের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ, সিটি কর্পোরেশন-চসিক’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ, চসিক হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা আশুতোষ দে, যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমেদ ইমু, উজ্জ্বল চক্রবর্তী, কার্তিক চন্দ্র দে, কল্যাণ ভট্টাচার্য, অ্যাডভোকেট দেবাশীষ দে মুন্না। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন হিন্দু সমাজকল্যান পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দে। অনুষ্ঠানের শুরুতে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে উদ্বোধন ঘোষণা করেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।

Print Friendly, PDF & Email

Related Articles

Back to top button